শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়

ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মানিব দেহের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট, এটি  কম বেশি আমাদের সকলেরই আছে । আপনি হয়ত জানেন না যে, প্রতি মুহূর্তে আমাদের দেহে প্রায় কয়েক লাখ জীবাণু আক্রমণ করে কিন্তু আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম সেগুলো ধ্বংস করে দেয় বলে আমরা সুস্থ্য থাকি । আর যে জীবাণু গুলো নষ্ট হয় না সেগুলোর কারণে আমরা অসুস্থ্য হই এবং আমাদের ডাক্তারের কাছে যেতে হয় । এটিই হচ্ছে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম । এটি বিভিন্ন সময় কমে আবার বাড়েও । শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় খুব বেশি কঠিন কিছু নয় ।

অনেককেই দেখবেন যাদের বড় বড় রোগ হলেও তাদের ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না বা খুব বেশি ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না । আবার অনেকের একটু ঠান্ডা কাশি হলেই ছুটতে হয় ডাক্তারের কাছে । এমন হলে বুঝবেন এই ব্যাক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পূর্বের ব্যাক্তির তুলনায় কম । এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, বয়সের সাথে সাথে ইমিউন সিস্টেম কমতে থাকে । কারণ বয়স বৃদ্ধির ফলে আমাদের দেহে পুষ্টির অভাব দেখা দেয় । যার কারণে বয়স্ক ব্যক্তিদের রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায় বেশি । তবে শিশু ও কম বয়সী মানুষদেরও মাঝেমাঝে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কমে যায় । ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই জরুরি একটি বিষয় । তাই আজ আমরা আলোচনা করব কিভাবে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায় সে সম্পর্কে ।

 

আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার স্বাস্থ্যকর উপায়

  • ধূমপান করবেন না।
  • ফলমূল ও শাকসব্জীগুলির উচ্চমাত্রায় একটি ডায়েট খান।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
  • একটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা.
  • আপনি যদি অ্যালকোহল পান করেন  সব চেয়ে ভাল পরিত্যাগ করা।
  • পর্যাপ্ত ঘুমান।
  • সংক্রমণ এড়াতে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন, যেমন আপনার ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং মাংস ভালভাবে রান্না করা। 

 

বেশি বেশি ফল খান

ফল খেতে আমরা কে না পছন্দ করি । ছোট থেকে বড় সবারই ফল দারুণ পছন্দের একটি খাবার । এখান হয়ত আপনার মনে ফলের দাম নিয়ে একটি প্রশ্ন আসছে ! তাহলে আপনাকে বলব পৃথিবীর সব দেশের মত আমাদের দেশেও ঋতুকালীন বিভিন্ন ফল পাওয়া যায় । সেগুলো দামে খুবই স্বল্প কিন্তু পুষ্টিতে ভরপুর । বাংলাদেশে বিভিন্ন ঋতুতে, বিভিন্ন রকম ফল পাওয়া যায়। প্রতিটি ফলে আলাদা আলাদা উপকারিতা বিদ্যমান। তবে, প্রত্যেকটি ফল আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় । তাই অবশ্যই নিজে এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে ফল খান ।

 

ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি যুক্ত খাবার খান

রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন সি এর কার্যকারিতা চিরকালই শোনা যায় । ডাক্তাররা প্রায়ই বিশেষ এই ভিটামিনটির কথা বলে থাকেন, বিশেষ করে শিশুদেরকে ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাওয়ানোর কথা বলেন । যাতে ছেলেবেলাতেই তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন উন্নত আর শক্তিশালী হয়ে ওঠে । একই সাথে, ভিটামিন বি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তুলতে অতুলণীয় ভূমিকা পালন করে থাকে ।

লেবু ও কমলালেবুতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়, এটা আমরা সবাই জানি । পেয়ারায় প্রচুর ভিটামিন সি আছে যা আমাদের দেশের প্রায় সব জেলাতেই হয়ে থাকে । এছাড়াও, জাম্বুরা, আমলকী ও আমড়ায়ও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে । আর ভিটামিন বি  পাবেন সব ধরণের ডিমে এবং দুধে । এছাড়া, দুগ্ধজাত সব খাবারেও পাবেন ভিটামিন বি ।

 

শাক সবজি খান

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে শাক সবজির বিকল্প নেই । আপনার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হলে আপনাকে অবশ্যই শাক সবজি খেতে হবে নিয়মিতই । আর জেনে রাখা প্রয়োজন যে, শাক-সবজির মধ্যে বিভিন্ন সবজির বীজও অন্তর্ভুক্ত ।

যেমন, বাঁধাকপিতে থাকা এক ধরনের উপাদান আছে যা রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম । সে-সব উপাদান অন্ত্র-এপিথেলিয়াল লিম্ফোসাইটস (আইইএল) হিসাবে পরিচিত । অন্ত্র এবং ত্বকের রোগ প্রতিরোধক কোষগুলোকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্যে করে এটি । এতো কেবল একটি সবজির গুণাগুণ । এরকম অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন উপকারিতা রয়েছে শাক সবজির ।

 

ভাত বেশি খাবেন না

একজন মানুষ প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার খাবেন, তার ৬০ শতাংশ হওয়া উচিত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা । এর পর ৩০ শতাংশ হতে হবে প্রোটিন এবং ৫ শতাংশের মতো থাকবে চর্বিজাতীয় খাবার । আমাদের দেশে দেখা যায়, শর্করা প্রচুর খাওয়া হচ্ছে কিন্তু সে পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ করা হয়না । অতিরিক্ত ভাত বা শর্করা জাতীয় খাবার খেলে সেটি শরীরের ভেতরে ঢোকার পর ফ্যাট বা চর্বিতে রূপান্তর ঘটে ।  রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরণের খাবার সুষমভাবে খেতে হবে । মোট কথা সুস্থ্য সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারি হতে চাইলে সুষম খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই । তাই ভাত এর পরিবর্তে মাঝে মাঝে শর্করা জাতীয় অন্য খাবার কেতে পারেন ।

 

রান্নার মধ্যে প্রয়োজনীয় মশলা ব্যবহার করুন

রান্নার মধ্যে মশলা ব্যবহার করার কথা শুনে অনেকে ঘাবড়ে যেতে পারেন । কেননা, অনেকের ধারণা মশলাযুক্ত খাবার ওজন বৃদ্ধি বা হার্টের অসুখের কারণ । আসলে, মশলাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পরিমিত মাত্রায় মশলা আপনার কোন ক্ষতি-তো করবেই না, বরং অনেক উপকার করবে ।

যেমন, রসুন এবং আদা উভয়ই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে । এছাড়া, রসুন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায় । বিশেষত, কাঁচা রসুনে অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল এবং ক্যান্সার বিরোধী উপাদান রয়েছে । আর আদা বমি বমি ভাব, সর্দি এবং হাঁচি, ঠাণ্ডা লাগার মত রোগের চিকিৎসার জন্য বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ।

অপর দিকে লং, গোল মরিচ গ্যাস্ট্রিকসহ অন্যান্য রোগে বেশ উপকারী । সব মশলার উপকারিতা এই সংক্ষিপ্ত লেখায় বর্ণনা করা সম্ভব নয় । তাই, রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে রান্না করার সময় মশলা ব্যবহার করুন । তবে মাত্রাতিরিক্ত মশলা ব্যবহার করা ক্ষতিকারক ।

 

“শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়”

 

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

আমরা অনেকেই ফিট থাকতে ব্যায়াম করি শুধু শারীরিক ভাবে ফিটই নয় শারীরিক ব্যায়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোসহ মানব দেহে অসংখ্য প্রভাব ফেলে ।  নিয়মিত ব্যায়াম শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ জাতীয় রোগ বালাই থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে । ব্যায়াম হিউমোরাল এবং সেলুলার ইমিউন সিস্টেম উভয়ের উপর প্রভাব ফেলে । ব্যায়াম করলে মানুষের শ্বাসযন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। ফলে, ঠাণ্ডা লাগা, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্যান্য রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

ব্যায়াম করার পর শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, যার দরুন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো বংশ বিস্তার বা বৃদ্ধি ঘটে না । এছাড়া ব্যায়াম স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে । ফলে, দুশ্চিন্তা কিংবা ক্লান্তি থাকে না । আর এই দুশ্চিন্তা থেকেও অনেক রোগ হয়ে থাকে । কাজেই, শারীরিক এবং মানসিক নানা রকম রোগ ব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম করা প্রয়োজন ।

 

দুশ্চিন্তা বন্ধ করুন

দুশ্চিন্তা নিজেই একটি রোগ । আর এই রোগ আপনার দেহে থাকলে সে অন্য রোগদেরকেও আপনার দেহে দাওয়াত করে নিয়ে আসবে । ঘুম না আসা, হৃদরোগ, মাথাব্যথা, ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ ইত্যাদি নানা রোগের কারণ দুশ্চিন্তা । কাজেই, এ-সব রোগ থেকে রেহাই পেতে হলে দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে ।

এটা সত্যি যে, কেউ তো আর ইচ্ছে করেই দুশ্চিন্তা করে না । জীবন চলার পথে নানা রকম টানা-পোড়নে পড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দেয় । এ সময় অনেকেই মানসিক চাপ সামলাতে পারে না । তবে, প্রচন্ড মানসিক চাপে পড়ে গেলে করণীয় কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো ফলো করার মাধ্যমে আপনি দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচতে পারেন ।

 

পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমান

ঘুমের অভাবে শরীরে টি কোষের কার্যকলাপ হ্রাস হয়ে যায় । ফলে, আপনার দেহে থাকা কোষগুলো রোগ জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করে জয়ী হতে পারে না । আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেয় কম ঘুম বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব । প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন, এটা সকলের জন্যেই প্রয়োজন ।

ঘুম অনেকটা রিচার্জের মতো । আমরা যদি স্মার্টফোনের ব্যাটারি পুরোপুরি রিচার্জ না করি, তবে যখন তখন চার্জ শেষ হয়ে বিপদে পড়ি । তেমনই যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমের ব্যাপারে সচেতন না হই, তবে শরীরের ইমিউন সিস্টেম ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করবে । তাই অবশ্যই নিয়মিত ঘুমানোর অভ্যেস গড়ে তুলুন ।

 

ওজন ঠিক রাখুন

অতিরিক্ত ওজন শরীর ও মন দুটোর জন্যই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ । বেশি বা অস্বাভাবিক ওজনের কারণে ডায়াবেটিস, হার্টে রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, অস্টিওআর্থ্রাইটিস নামক রোগ হয়ে থাকে । বুঝতেই পারছেন এ-সব রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যখন আপনার ওজন বৃদ্ধি পায় ।

সুতরাং, ইমিউন সিস্টেমকে সুপার পাওয়ার দিতে হলে আপনার ওজনকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে হবে । ওজন কমানো বা কন্ট্রোলে রাখা কিন্তু খুব একটা সহজ কাজ নয় । এ জন্যে একজন মানুষকে ঘুম, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে আরো অনেক কিছু মেনটেন করতে হয় । তবে, ওজন কমানোর সঠিক কিছু উপায় আছে, আপনাকে সেগুলো জানতে হবে এবং মেনে চলতে হবে ।

 

ধূমপান বন্ধ করুন

সিগারেটের বক্সেই লেখা থাকে ধূমপান মৃত্যু ঘটায় । সুতরাং ধূমপানের অপকারিতা আমাদের না বললেও চলবে । ধূমপান করলে, আপনার দেহ রোগ জীবাণুর জন্য অভয়াশ্রমে পরিণত হবে । দেহকে রোগ জীবাণু থেকে মুক্ত রাখতে হলে আজকে থেকে ধূমপান পরিহার করুন আর দেখুন আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতখানি বেড়ে গিয়েছে ।

যারা ধূমপান করেন, তাদের প্রায় সবাই এর সাইড ইফেক্টের কথা জানেন । আর এই নিয়মিত ধূমপায়ী মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই আছেন যারা প্রায়ই ধূমপান ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবেন । কিন্তু কেন যেন পেরে ওঠেন না । আসলে যারা ধূমপান করেন, তাদের রক্তের কণায় কণায় নিকোটিনের চাহিদা তৈরি হয়ে আছে । তাই, কেউ হয়তো ১ দিন ধূমপান না করে থাকতে পারছেন, কেউ ২ দিন, আবার কেউ হয়তো অনেক দিন ।

যে যতই বলুক না যে, ধূমপান ত্যাগ করা শুধু মাত্র নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল; আসলে এটি ছাড়া অনেক কঠিন একটা কাজ । যারা ছাড়ার চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি, তারাই ভাল বলতে পারবেন । তবুও চেষ্টার বিকল্প নেই আর চেষ্টাতেই মানুষ সফলতা লাভ করে ।

 

“শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়”

 

শেষ দুটি কথা

একজন মানুষের স্বাস্থ্যবান তার মানে এই না, তার ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি । রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ভর করে একজন মানুষের সুষম স্বাস্থ্যের উপর । তাই আপনি মোটা কিংবা পাতলা সেটার দিকে বেশি নজর না দিয়ে চেষ্টা করুন একটা ব্যালেন্স খাবার এবং জীবন যাপনের । তাহলেই আপনি সুস্থ্য সুন্দর একটি জীবন পেতে পারেন ।