ঈদ-গরুর মাংস এবং স্বাস্থ্য ঝুকি থেকে মুক্তির উপায় । সামনেই আসছে মুসলিম বিশ্বের সব চেয়ে বড় উৎসব কোরবানীর ঈদ। কোরবানীর ঈদ মানেই হাসি,আনন্দ আর পশুকোরবানী। কোরবানীর পশুর মধ্যে আমাদের কাছে গরুটাই সার্বাধিক জনপ্রিয় । এই সময়টায় বাড়িতে বাড়িতে গোস্ত রান্না এবং খাওয়ার ধুম পড়ে যায় । আমাদের অনেকেরই গরুর গোস্তের কথা মনে হলেই জিব্বায় পানি এসে পড়ে । কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না এই গরুর গোস্তের অনেক পুষ্টি গুণাগুনের পাশাপাশি অনেক উপকারিতাও রয়েছে। তাই আজ আমরা গরুর গোস্তের A টু Z জানব । তাহলে চলুন শুরু করা যাক-

 

গরুর গোস্তের পুষ্টিগত দিক 

গরুর মাংস প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত। প্রাণী থেকে সংগৃহীত হয় বলে এটি প্রাণিজ প্রোটিন। প্রোটিন ছাড়া আরো বিভিন্ন

ধরনের পুষ্টি উপাদান গরুর মাংসে বিদ্যমান।যেমন: প্রোটিন,ফ্যাট,মিনারেলস,ভিটামিন ইত্যাদি ।

 

গরুর গোস্তের স্বাস্থ্য উপকারিতা

প্রোটিনের উৎস: গরুর গোশত থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায় তাতে পেশি গঠনের সব এমাইনো এসিড আছে। সুগঠিত

গোশতপেশি শরীরে বিভিন্ন এনজাইম ও হরমোন উৎপাদিত হয়। গরুর গোশত স্পার্মের (শুক্রাণুর) পরিমাণ ও গুন বৃদ্ধি করে

বন্ধ্যাত্বতা দূর করে।শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরনের এমাইনো এসিড রয়েছে গরুর গোশতে ।

 

আয়রনের উৎস: গরুর গোশতে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ আছে। সপ্তাহে দুইবার গরুর গোশত খেলে রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীরে

অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় আয়রনের চাহিদা পূরণ হয় এবং এনেমিয়া প্রতিরোধ করে।

 

জিঙ্কের উপস্থিতি: গরুর গোশত দেহের জিঙ্কের অভাব পূরণ করে। জিঙ্ক মানুষের পেশিকে সবল করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

 

ভিটামিন বি: গরুর গোশত বিভিন্ন রকম ভিটামিন-বি-এর একটি অন্যতম উৎস। সুস্থ শরীরের জন্য প্রাকৃতিক উৎসের ভিটামিন-

বি গ্রহণ করা জরুরী। গরুর গোশতে আছে ভিটামিন-বি-১২, যা নার্ভ সচল রাখে ও ভিটামিন-বি-৬, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

বাড়ায়। এছাড়াও গরুর গোশতে নিয়াসিন আছে যা হজমে সহায়তা করে এবং রিবোফ্লাবিন যা চোখ ও ত্বক ভালো রাখে।

 

বর্ধনশীল বাচ্চাদের জন্য গরুর গোশতে উপকারীতা: বর্ধনশীল বাচ্চা বা টিনএজার দের সমর্থ ও শক্তিশালী করে গড়ে

তুলতে গরুর গোশতের তুলনা নেই। শুধু শারীরিক বর্ধন নয়, বুদ্ধি-বৃত্তিক গঠন এবং রক্ত বর্ধনেও এটি ভূমিকা রাখে।

 

টরিন: ইহা এন্টিওক্সিড্যান্ট এমাইনো এসিড। ইহা হার্ট ও গোশত পেশীর কার্য্যক্রমে দরকারি।

 

প্রচুর পরিমাণ সেলেনিয়ামও পাওয়া যায়ঃ

সেলেনিয়ামে অন্তর্ভুক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এ সেলেনিয়ামে অন্তর্ভুক্ত প্রোটিনকে সেলোপ্রোটিন বলে। সেলেনিয়ামে ভিটামিন ‘ই’, ভিটামিন ‘সি’, গ্লুটাথায়োনিন এবং ভিটামিন বি-৩ রয়েছে। এ ছাড়া সেলেনিয়ামে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে যা ফ্রি র‌্যাডিকেলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে রক্ষা করে ও অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী ক্যান্সার, হৃদরোগ প্রভৃতির ঝুঁকি কমায়। সেলেনিয়াম শুক্রাণু তৈরিতে এবং পুরুষ ও নারীর বন্ধ্যত্ব দূর করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া এইডস প্রতিরোধে এবং নিরাময়ে সেলেনিয়ামের ভূমিকা অপরিসীম।ইহা থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখে। গরুর গোশতে আছে Conjugated Linoleic Acid (CLA)। এটি ক্যান্সার প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক বলে গবেষনায় প্রমাণিত হয়েছে । গরুর গোস্ত মস্তিষ্ক ও পেশীতে শক্তি সংরক্ষন করে।

 

ঈদ-গরুর মাংস এবং স্বাস্থ্য ঝুকি থেকে মুক্তির উপায় গুলো –

গরুর মাংসে কোলেস্টেরল বেশি থাকে অতিরিক্ত গরুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কারণ গরুর মাংসে থাকে কোলেস্টেরল,

ফ্যাট ও সোডিয়াম। কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, তাঁদের

অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

 

উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে গরুর মাংসের অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টিতে বা বাড়াতে

সোডিয়াম সাহায্য করে। তাই অতিরিক্ত গরুর মাংস ঘন ঘন খেলে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে, যা হৃদরোগ, স্ট্রোক বা কিডনি

রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে অতিরিক্ত গরুর মাংস খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা থেকে পরবর্তীকালে আরো অনেক

রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

 

কিডনি রোগ ঝুঁকি বাড়ায় গরুর মাংস প্রথম শ্রেণীর প্রোটিনের ভালো উৎস। তাই অতিরিক্ত গরুর মাংস খেলে তা থেকে প্রাপ্ত

প্রোটিন কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই যাঁদের কিডনিতে সমস্যা রয়েছে তাঁদের অবশ্যই গরুর মাংস এড়িয়ে যেতে হবে।

তাছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যাঁরা অতিরিক্ত গরুর মাংস খান, তাঁদের ক্যানসার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

উপরে গরুর গোশতের কিছু ক্ষতিকর দিক দেখে ভীত হওয়ার কিছু নেই । যাদের খুব বড় ধরনের কোনো সমস্যা নেই তারা নিয়ম

মেনে সীমত আকারে খেতে পারেন । এতে আপনার তেমন কোনো ক্ষতি হওয়ার ঝুকি নেই ।

 

কিভাবে গরুর গোস্ত খাওয়া উচিত

গরুর মাংসে কোলেস্টেরল এর মাত্রা ৩ আউন্স মাংসে কোলেস্টেরল এর মাত্রা ৫৩ মিলিগ্রাম। একজন সুস্থ মানুষের

কোলেস্টেরল এর দৈনিক নিরাপদ মাত্রা হলো ৩০০ মি.গ্রা. এবং হার্টের রোগীর জন্য ২০০ মি.গ্রা.। সুতরাং ৩ আউন্স গরুর মাংসে

কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক নিচে। গরু, মহিষ, ছাগল ও খাসির মাংসে থাকে উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও ফ্যাট, তাই

অতিরিক্ত পরিমাণে গরুর মাংস খেলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও কোলেস্টরেলের মাত্রা বেড়ে যায়, বিশেষ করে যারা আগে থেকেই

এসব রোগে ভুগছেন তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। আর তাই মাংস খাওয়ার সময় অবশ্যই চর্বি ছাড়া এবং পরিমাণ মতো খাওয়া

উচিত।

 

আশা করি উপরে বর্নিত আর্টিকেলটি আপনাদের ঈদ এবং সুস্বাস্থ এই দু ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাজে প্রভাব ফেলবে না এবং

আপনি থাকবেন হাসি,খুশি এবং সুস্থ । সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।