শীতকালীন কিছু রোগ ও তার প্রতিকার

শীতকালীন কিছু রোগ ও তার প্রতিকার-শীতকাল আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে দিয়েছে । হিম হিম শিতল বাতাসের সাথে সাদা সাদা তুলোর মতো কুয়াশার চাদর আমাদের পরিবেশ ঢেকে নিচ্ছে চারপাশ থেকে । শীতকাল বাঙালীর কাছে এক দিকে যেমন আনন্দ উৎসবের বারতা নিয়ে আসে ঠিক তেমনি ভোগান্তিরও আরেক নাম এই শীতকাল । শুধু অসুখ-বিসুখের কারণে বলছি ঠিক তা নয় । প্রচন্ড শৈত্য প্রবাহ প্রান্তিক গ্রামীন মানুষের জন্য যেন এক বিভিষিকার নাম এই শীতকাল । ঠান্ডা,কাশি থেকে শুরু করে ঠোঁট ফাটা,পায়ের গোড়ালি ফাটা এছাড়াও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার মত রোগ গুলো তাদের জীবন কে প্রায় অতিষ্ট করে তোলে । তাই আজ আমরা শীতকালীন এই সব সাধারণ রোগ গুলি সম্পর্কে জানব এবং কিভাবে এগুলো থেকে বেচে থাকা যায় সেগুলোও জানব । তাহলে চলুন শুরু করা যাক-

ঠোঁট শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যাওয়াঃ

শীতকালে গ্রাম থেকে শহর সব মানুষের কাছেই যে সমস্যাটি প্রধান হয়ে দাঁড়ায় তা হচ্ছে ঠোঁট শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যাওয়া । এটি সবার কাছে এত বেশি গুরুত্ব পাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে এর সৌন্দর্য্যপ্রিয়তা । ঠোঁট আমাদের,বিশেষত মেয়েদের কাছে খুবই আবেগের একটি অঙ্গ । তাই এর শুকিয়ে সৌন্দর্য্য হারানো কারো কাছেই কাম্য নয় । ঠোঁট শুষ্কতা রোধ করার জন্য অনেকেই হয়ত অনেক ধরনের প্রস্বাধনী ব্যবহার করছেন কিন্তু আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না । তাই আমরা নিচে এমন কিছু টিপস দিচ্ছি আশা করি এই সমস্যাটি থেকে সকলেই মুক্তি পাবেন ।

ঠোঁট ফেটে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে বাতাসের আর্দ্রতা কমে গিয়ে আমাদের ত্বক দিয়ে পানি বেরিয়ে যায় । এর ফলে ঠোঁট ফেটে যায় । তাই যদি এই আর্দ্রতা রাখা যায় তাহলেই ঠোঁট ফেটে যাওয়া রোধ করা সম্ভব ।

ঠোঁট ফেটে যাওয়া রোধে করণীয়ঃ

  • চাইলে ঠোঁট ফেটে যাওয়া, রুক্ষ হয়ে যাওয়া এসবের হাত থেকে বাচতে গ্লিসারিন বা ভ্যাসলিন ব্যবহার করতে পারেন । তবে   অবশ্যই দেখে নিবেন সেটা ভাল কোনো ব্র্যান্ডের এবং সেটার মেয়াদ আছে কি না ।
  •  তীব্র শীত বা গড়ম দুটো থেকেই ঠোটকে বাচিয়ে চলুন । এজন্য মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন ।
  • খাবার বা পানীয় অতিরিক্ত গরম অবস্থায় না খেয়ে কুসুম কুসুম ঠাণ্ডা করে ্পান করুন ।
  • ঠোঁট কামড়ানো, নখ দিয়ে ঠোঁটের চামড়া টানা এসব অনেকেরই বদ অভ্যেস রয়েছে । এগুলো পরিত্যাগ করুন ।
  • ঠোঁটের ত্বক অনেক বেশি স্পর্শকাতর বা সংবেদনশীল তাই একে যেকোনো রকমের আঘাতের হাত থেকে বাচিয়ে চলুন।

এছাড়াও শীতকালে আরো বেশ কিছু রোগের মোকাবিলা আমাদের করতে হয় । এখন জানব এসব রোগ এবং প্রতিকার সম্পর্কে ।

শীতকালীন কিছু সাধারণ রোগ ও সমাধান

ভাইরাস জ্বরঃ শীতের আবির্ভাবের সাথে সাথে ভাইরাস ঘটিত জ্বর বেশ পরিচিত এবং সাধারণ একটি সমস্যা । এটি শিশু থেকে

বৃদ্ধ প্রায় সবাইকেই আক্রমণ করতে পারে । ভাইরাস ঘটিত জ্বর গুলির মধ্যে অ্যাডিনোভাইরাস, রাইনোভাইরাস ইনফ্লুয়েঞ্জা

ইত্যাদি ঘটিত জ্বরই প্রধান । বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মাঝে যাদের ডায়াবেটিস, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস রয়েছে তারা এই সব

রোগের ঝুকিতে বেশি থাকেন ।

 

কেউ রোগে আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রচুর তরল জাতীয় খাবার, বিশেষত খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, লেবু-চিনির শরবত এ

সময়টায় বেশ উপকারী । এ সময়ে ঠাণ্ডা পানীয় ও আইসক্রিম সম্পূর্ণ নিষেধ । পানি ফুটিয়ে কুসুম গড়ম অবস্থায় পান করা

উত্তম। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ সেবন করা যেতে পারে । তবে অবস্থা বেশি খারাপ হলে

চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে ।

 

অ্যাজমা সমস্যাঃ অনেকেই আছেন যাদের অ্যাজমা সমস্যা রয়েছে । শীতকালে এই সমস্যা আরো বেড়ে যায় । এটি মূলত

শ্বাসকষ্ট জনীত একটি রোগ । অ্যাজমা হলে শ্বাস-প্রঃশ্বাসে সমস্যা দেখা দেওয়া, বুকে চাপ অনুভত হয়া, হাঁপাতে থাকে, নিঃশ্বাস

নেওয়ার সময় তীব্র যন্ত্রণা হওয়া ইত্যাদি এই রোগের লক্ষ্মন ।

 

এই রোগ হলে প্রথমে সাধারণ কিছু ওষুধ নিতে পারেন । তবে সমস্যা বাড়তে থাকলে এন্টিবায়োটিক নিতে হবে । আর সে ক্ষেত্রে

অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই নিতে হবে । কারন এন্টিবায়োটিক ভাল যেমন করতে পারে তেমনি অবস্থা আরো খারাপও

করে দিতে পারে ।

 

নিউমোনিয়াঃ নিউমোনিয়া রোগটি বিশেষত শিশুদের আক্রমণ বেশি করে থাকে । এতে শ্বাসনালীর পরিবর্তে ফুসফুসের প্রদাহ

হয়। এখানেও জ্বর, কাশ ও তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে । এক্ষেত্রে নাকের স্প্রে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ইনহেলারও ব্যবহার করতে হতে

পারে ।

 

মাম্পসঃ এই রোগটি সাধারণত শিশু ও কিশোরদের মাঝেই বেশি দেখা যায় । ঠাণ্ডা বাতাস লাগার ফলে যখন কারো রোগ

প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে তখন প্যারামিক্সোভাইরাস দ্বারা লালা গ্রন্থি(প্যারোটিড গ্ল্যান্ড) আক্রান্ত হয়। তখন নীচের চোয়াল

সহ গাল ফুলে উঠে। রোগী বড় করে মুখ খুলে হা করতে পারে না। সে সাথে জ্বরও থাকে। গালের ফোলা সপ্তাহ খানেক হতে

দশদিন পর্যন্ত থাকে। সাধারণত একদিকেই লালা গ্রন্থি আক্রান্ত হয়। মাম্পস হতে কখনো কখনো অন্য অঙ্গও আক্রান্ত হয়। তাই

সচেতন থাকুন আপনার বাচ্চাটিও এই রোগে আক্রান্ত হল কি না খেয়াল রাখুন । আক্রান্ত হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন ।

প্রয়োজনীয় কিছু টিপসঃ

  • শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিন উষ্ণ গরম পানি বা যে কোনো গরম পানীয় যেমন- চা, কফি, স্যুপ, দুধ খাওয়া ভালো। তাতে শরীরের  উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় ।
  • প্রতিদিন কিছু পরিমাণ কালিজিরা রান্না করে বা রান্না ছাড়া খেতে পারেন। কালিজিরা প্রায় ৩০০ রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • ঠাণ্ডা লাগলে বা কাশি হলে আদা ও লবঙ্গ অত্যন্ত কার্যকরী। আদা ও লবঙ্গের রস ঠাণ্ডা কাশি কমাতে সহায়ক। আদা ও লবঙ্গ দিয়ে চা খুবই কার্যকর।
  • সরিষার তেল শরীর গরম রাখে যা ঠাণ্ডা লাগার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
  • শীতকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা বেশি প্রয়োজন। শীতে ধুলাবালি বেশি থাকায় তাতে রোগ-জীবাণু বেশি থাকে এবং সে কারণে অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।  তাই অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

 

সবশেষে কিছু কথাঃ প্রতিশেধকের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম । তাই এই শীতের সময়ে বাড়তি সচেতনাতা অবলম্বন করুন । নিজে

এবং নিজের পরিবারকে সুস্থ্য রাখুন ।