বয়ঃসন্ধিকালীন সময় মানুষের জীবনের এমন একটি অধ্যায় যা মানবের জন্য একই সাথে রোমাঞ্চ,সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর সুন্দরের এক মিশ্র অধ্যায় । যে সময় টুকুতে সঠিক ভাবে পরিচালিত হলে একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারেন পরিপূর্ণ, আবার মিস গাইডেড হলে চলে যেতে পারেন অন্ধকারের অতল গহবরে । ১৩-১৮ বছর এই সময় কাল কে সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল হিসেবে গণ্য করা হয় । প্রতিটি মানুষকেই এই স্টেজ পার হয়ে আসতে হয় । শৈশব এবং যৌবনের মাঝামাঝি এই  সময় টুকুকে বলা হয় বয়ঃসন্ধিকাল বা কৈশর কাল । এই সময়ে কিশোর কিশোরীদের দ্রুত শারীরিক এবং মানুষিক বর্ধন হতে থাকে।এ অবস্থাকে মনোবিজ্ঞানীরা আকস্মিক বর্ধন বলে থাকেন । বয়ঃসন্ধিকালে একজন মানবের সহজাত প্রবৃত্তিগুলো ক্রমশ বিকাশ লাভ ও পূর্ণতা লাভ করে । এই সময়ের  একজন কিশোর বা কিশোরী শিশুও নয় আবার বয়স্কও নয় । এ এক অদ্ভুত দশা মানব জীবনের । তাই আজ আপনাদের সাথে আলোচনা করব বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা ও প্রতিকার নিয়ে।চলুন শুরু করা যাক-

 

বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা ও প্রতিকার

 

এ সময়ে কিশোর কিশোরীদের আবেগ,অনুভুতি,সামাজিক সচেতনেতা গড়ে ওঠে । এই বয়সের কিশোর-কিশোরীরা জীবন ও

জগতকে জানতে চায়।বয়ঃসন্ধিকালে দেহের মাংসপেশী, হাড়, গ্রন্থি, মস্তিষ্ক, হৃৎপিন্ড, বাকযন্ত্র, শরীরের ওজন ও দৈর্ঘ্য বাড়ে । এ

সময় রক্ত সঞ্চালন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পাকস্থলীর ক্ষমতা বাড়ে । এই জন্য দেখা যায় বয়সের তুলনায় কিশোর কিশোরীদের গলার স্বর

অন্য রকম বা ভেংগে যাচ্ছে এমন । এছাড়াও ছেলেদের দাড়ি, গোঁফ দেখা দেয় এবং হাত-পা ও বুক লোমশ হয়ে উঠে । ছেলেদের

স্বপ্নদোষ শুরু হয় । মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়, বক্ষ উন্নত হয় এবং কোমড় মোটা হতে থাকে।এভাবে ধিরে ধিরে যৌন অঙ্গ

গুলির বিকাশ ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে এবং যৌন ইন্দ্রিয়ের পূর্ণনতার মাধ্যমে কিশোর কিশোরীদের প্রজনন ক্ষমতা তৈরী হয় । এ

সময়ে সাধারণত বিপরিত লিঙ্গের প্রতি দূর্নিবার আকর্ষন জন্মায় । আর এ কারণেই অনেক ছেলে মেয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে

পরে । এছাড়াও ছেলে মেয়েদের মাঝে একটা বড় বড় ভাব লক্ষ্য করা যায় এবং তারাও এটি খুব উপভোগ করে এবং বেশির ভাগ

ক্ষেত্রে তারা বড়দের মত আচরণ শুরু করে । আর ঠিক এই জায়গাটাই হচ্ছে সব চেয়ে বিপত্তির । কিশোর কিশোরীদের মাঝের

এই পরিবর্তন গুলি যে স্বাভাবিক এবং প্রয়োজন তা বোঝানো এবং উপলব্ধি করানোটাই মূল বিষয় । আর এ ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড়

ভূমিকা পালন করতে হবে পিতা মাতা থেকে শুরু করে বাড়ির প্রতিটি বয়ঃপ্রাপ্ত সদ্যসকেই । কিশোর কিশোরীদের প্রতি তাদের

আচরন কেমন হবে তার উপরেই মূলত নির্ভর করে সেই কিশোর কিশোরী সঠিক পথে থাকবে নাকি বিপথে চলে যাবে ।

 

বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোরদের সাধারন কিছু প্রবনতা এবং সমস্যা ও প্রতিকার

 

এই সময়ে কিশোর কিশোরীদের মাঝে কিছু ভুল ভ্রান্তি যেমন প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো,যৌনতার প্রতি আকর্ষন, লুকিয়ে লুকিয়ে

বড়দের মত দাড়ি সেভ করা বা বিড়ি-সিগারেট পান করা ইত্যাদি খুব স্বাভাবিক কিছু ঘটনা। এই সময়ে বাবা মা থেকে শুরু করে

বেশির ভাগ সিনিয়ার সদস্যরাই যে ভুল করে থাকেন তা হচ্ছে, তাদের অপমান,বকাঝকা বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মার-ধরের ঘটনাও

ঘটে থাকে।যা একদমই অনুচিৎ। এতে করে সেই কিশোর কিশোরী সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসার পরিবর্তে উলটো সেদিকেই

আরো ঝুকে পড়ে। কারণ এই সময়ে তাদের মাঝে প্রচন্ড রকম জেদ কাজ করতে থাকে। তাই আমাদের উচিৎ তাদের সাথে

খারাপ ব্যবহারের পরিবর্তে বন্ধুবৎসল ব্যবহার করা এবং প্রকৃতির সাধারণ এই নিয়মটিকে সহজ ভাবে তাদের বোঝানো।

 

বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা ও প্রতিকারে গবেষকরা যেসব বিষয়ে সচেন থাকতে বলেন

গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই সময়ে বাবা মা,ভাই বোন বা আত্মীয় স্বজনদের মাঝে যারা বয়ঃপ্রাপ্ত তাদের যেসব বিষয়ে সচেন থাকতে

বলেন বা কিশোর কিশোরীদের প্রতি যেসব দায়িত্ব রয়েছে নিচে সে গুলো পয়েন্ট বাই পয়েন্ট তুলে ধরা হল-

  • কিশোর কিশোরীদের নির্বিশেষে সবার আগে ‘মানুষ’ হিসেবে আত্মপরিচয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া।
  • জীবনের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপ ও এর স্বাভাবিকতা, বৈশিষ্টগুলো নিয়ে আলোওচনা করা ও বোঝানো।
  • পড়াশোনায় সামর্থ নিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনায় এনে তার অর্জিত ফলাফল নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন না করা।যেটি আমরা সব চেয়ে বেশি করে থাকি!এই ধরনের চাপ কিশোর কিশোরীদের জন্য খুবই মারাত্মক।তাই উচিৎ তাকে উৎসাহিত করা।
  • কখনই শারীরিক শাস্তি দিবেন না।যত ভুলই করুক নিজেকে শান্ত রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেশটা করুন।কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কিশোর কিশোরীরা আবেগ প্রবন হয়ে খুব ছোট কারণেও আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলে।
  • বাড়ির ছোট ছোট কাজ গুলোতেও তাদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করুন।এতে করে আপনার সন্তান এক দিকে যেমন আপনার কাছাকাছি থাকবে অন্যদিকে তারা খুশি হবে তাদের মূল্যায়ন পেয়ে।
  • তাদেরকে কাছে নিয়ে খুব সুন্দর করে তাদের নিয়ত পরিবর্তনশীল বর্ধন, বিশেষ করে প্রজননতন্ত্রসমূহের যত্ন এবং কাজ সম্পর্কে জানান।তার শরীরের উপর তার ছাড়া কারোর কোনো অধিকার নেই এবং পরবর্তীতে তার অধিকার সম্পর্কে জানান এবং বোঝান।

 

শেষ কিছু কথা

আপনি আপনার সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখুন যেন আপনার সন্তান বিশেষ এই সময়ে গুটিয়ে না যায়, একা একাই যেন তাকে এই

সময় টুকু পার না করতে হয়,সে জন্য খারাপ কারো সাথে বিপথে না যায়,খেয়াল রাখুন তার বন্ধু বান্ধব এবং মেলামেশা সম্পর্কে ।

আপনার সন্তানকে সময় দিন,বোঝান,খারাপ ব্যবহার পরিহার করুন এবং আপনার সন্তানকে দিন একটি সুন্দর এবং নিশ্চিত

ভবিষ্যৎ । সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।পরবর্তী আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন ।