গোমূত্র পান করা কি স্বাস্থ্যকর

গোমূত্র পান করা কি স্বাস্থ্যকর-প্রথমেই আমার সকলের কাছে অনুরোধ থাকবে, দয়া করে লেখাটি পুরোটা পড়ুন তারপর মন্তব্য করুন । এই লেখা দিয়ে কোনো বিশেষ জাতী, ধর্ম, বর্ণ বা দেশকে অথবা কোনো মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করা আমার লক্ষ্য নয় । আমি শুধু এই বিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান এর কথা গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব এবং এর মাঝে থাকা অন্ধ বিশ্বাস,কুসংস্কার দূর করার চেষ্টা করব ।

মূত্র পান করা এই কথাটি শুনলেই প্রথমে আপনার চোখে কোন চিত্রটি ভেসে ওঠে? হয়ত অনেকেরই চোখে ভেসে উঠবে ডিসকভারি চ্যানেলে দেখা সাহারা মরুভূমিতে বেয়ার গ্রিলস এর সেই মূত্র পানের দৃশ্যটি । আবার অনেকের চোখেই ভেসে উঠবে গরুর মূত্র পান করার দৃশ্য । যা ঈদানীং ইউটিউবে হর হামেইশাই দেখা যাচ্ছে । অনেকে আবার এর বিভিন্ন উপকারিতা নিয়ে রিতীমত প্রচারণা চালাচ্ছেন ! কিন্তু আসলেই কি এর কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারীতা রয়েছে ? চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলছে ? নাকি এটা শুধুই কিছু মানুষের অন্ধ বিশ্বাস এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে পান করছে ? আজ আমরা এসব কিছু নিয়েই আলোচনা করব । তাহলে চলুন শুরু করা যাক-

 

গোমূত্র নিয়ে নতুন তামাশা ভারতে,চলছে গোমূত্র পার্টি ! জানতে এখানে ক্লিক করুন 

 

মূত্র কি?

যেহেতু মুত্র বা প্রস্রাব নিয়ে কথা বলব তাই এটা জানা জরুরী যে, মুত্র জিনিসটা আসলে কি? উইকিপেডিয়ার মতে, মূত্র হচ্ছে সেই বস্তু যা নেফ্রনের বিভিন্ন অংশের সক্রিয়তার ফলে দেহের পক্ষে ক্ষতিকারক অথবা অপ্রয়োজনীয় জৈব ও অজৈব পদার্থ দিয়ে তৈরী স্বল্প অম্লধর্মী ও সামান্য হলুদ বা বর্নহীন তরল যা মূত্রাশয়ে সঞ্চিত হয় এবং পরে মূত্রনালী দিয়ে দেহের বাইরে নির্গত হয় তাকেই মূত্র বলে। রেফারেন্স

এখানে একটি আমার ব্যাক্তিগত প্রশ্ন, মূত্র যদি দেহের জন্য ক্ষতিকারক অথবা অপ্রয়োজনীয় না হবে তাহলে দেহ কেন এটা বের করে দিচ্ছে? খাবার এবং পানীয়  পরিপাক করে দেহের জন্য প্রোয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান রক্তের মাধ্যমে দেহ শুষে নেয় । যদি মূত্রও প্রয়োজনীয় হত তবে দেহ অবশ্যই মূত্র ভেতরেই রেখে দিত । সেটা যেকোনো প্রানীর ক্ষেত্রেই হোক ।

 

গরুর মূত্রের জাদুকরী শক্তি !

হ্যা ঠিকই পড়েছেন, গরুর মূত্রের জাদুকরী শক্তি ! আসলেই কি এটি কোনো মহৌষধ যাকে আমরা জাদুকরী শক্তি বলছি ?

আপনি যদি ইউটিউবে গিয়ে এই কি-ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করেন তাহলে খুব সহজেই অনেক গুলো ভিডিও পাবেন যেখানে প্র্যাক্টিকালি দেখানো হচ্ছে গোমূত্র মানুষের জন্য কতটা উপকারী এবং আমাদের শরীরকে সুস্থ্য রাখতে কতটা সাহায্য করছে ! তারা সেখানে প্রথমে বিটাডিন বা এই জাতীয় অন্যান্য ক্যামিকেলস পানির সাথে মিশিয়ে দেখাবে একটি ভয়ংকর রকমের  বিষক্রিয়া এবং পরবর্তীতে সেখানে গোমুত্র ঢেলে দিয়ে দেখাবে আবার পানি পূর্বের অবস্থায় মানে পরিষ্কার এবং নিরাপদ অবস্থায় ফিরে আসছে !

কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে আপনি যদি সেখানে গোমূত্রের বদলে আপনার নিজের মূত্রও ব্যবহার করেন দেখবেন একই ফলাফল ! তাহলে মূল বিষয়টা কি দাড়ালো ? তাহলে কি গোমূত্রের বদলে নিজের মূত্রও পান শুরু করে দিতে হবে !

রেফারেন্স

 

গরুর মূত্র ক্যান্সারের নিরাময় করতে পারে !

কেউ যদি গুগলে গিয়ে “গরুর মূত্র ক্যান্সারের নিরাময় করতে পারে”, এই কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করেন তাহলে এমন কয়েক হাজার খবর বা তথ্য পাবেন যেখানে মানুষ দাবি করছে গোমূত্র ক্যান্সার নিরাময় করতে সক্ষম । এমনকি কিছু কিছু প্রভাবশালি ব্যাক্তিও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে দাবি করছেন এবং প্রমানও নাকি তারা পেয়েছেন !

কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে তারা কেউই কোনো রেফারেন্স দেখাতে পারছেন না ! তার মানে সবই ভুয়া কথা । গত কয়েকদিন ধরে এই বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করে এমন কোনো ডাক্তার বা গবেষকের একটি মাত্রও রেফারেন্স পাইনি যে কেউ এমনটি দাবি করছেন । বরং এটি যে একটি ভুয়া এবং অতি কাল্পনিক দাবি তার পক্ষেই সবাই মত দিয়েছেন । নিচে দুটো রেফারেন্স দিলাম দেখে নিতে পারেন ।

রেফারেন্স

রেফারেন্স

 

হার্ট ও কিডনিসহ সারা শরীরের জন্যই গোবর ও গোমূত্র পান করা স্বাস্থ্যকর

ত্রিবেন্দ্র সিং রাওয়াত নামক জনৈক এক রাজনীতিক কিছুদিন আগে এমনটি দাবি করেন যে, “গরু আমাদের অক্সিজেন দেয় বলেই তাকে মাতা বলা হয়। হার্ট ও কিডনিসহ সারা শরীরের জন্যই গোবর ও গোমূত্র খুবই উপকারী। গরুর পাশে থাকলে টিবি রোগ ভালো হয়ে যায়। আমাদের বিজ্ঞানীরাও এখন এই প্রশংসাপত্র দিয়েছেন।” রেফারেন্স

এখানেও সেই একই কথা প্রযোজ্য তিনি মুখে যতই দাবি করুন না কেন কোনো গবেষকের নাম তিনি উল্লেখ করতে পারেননি । পরবর্তীতে এটি সামাজিক মাধ্যম গুলিতে ভাইরাল হলে, সাংবাদিক রা জানতে চাইলে স্রেফ এটিকে একটি বিশেষ অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস বলে আখ্যায়িত করেন । আর বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, এখনো এমন কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি যে গরুর গোবর বা মূত্র থেকে হার্ট বা কিডনির রোগ সারাতে পারে আর গরু মোটেও অক্সিজেন গ্যাস ত্যাগ করে না,মিথেন গ্যাস ত্যাগ করে ।

 

গোমূত্র পান করা কি স্বাস্থ্যকর

 

গোমূত্র নিয়ে কিছু মজার এবং ভয়ংকর তথ্য

প্রথমেই গোমূত্র সম্পর্কে একটি মজার তথ্য জেনে নেওয়া যাক, ভারতের বিশেষ কিছু অঞ্চলে গরুর  দুধের দাম এর চেয়ে গরুর

মূত্রের দাম বেশি ! এক লিটার দুধের দাম সেখানে ২০-২২টাকা আর এক লিটার মূত্র ৫০টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে ! অঞ্চল

ভেদে এর দাম কোথাও কোথাও ১০০-২০০টাকা লিটার পর্যন্তও হয়ে থাকে ! রেফারেন্স

 

আর ভয়ংকর তথ্যটি হচ্ছে এই অন্ধ বিশ্বাস চলে গেছে ব্রিটেন এর লন্ডন পর্যন্ত ! বলে রাখা ভাল সেখান এর ক্রেতা ব্রিটিশরা নন ।

সেখানে বসবাসরত হিন্দুরাই মূলত পূজা ও বিভিন্ন কাজে এটি কিনে থাকেন ।

লন্ডন ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সীর একজন কর্তা ব্যাক্তি এতা নিশ্চিত করেছেন যে, এটি বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেবল মাত্র

হিন্দুদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহার করার কথা চিন্তায় রেখে তবে তা কোনো ভাবেই খাদ্যদ্রব্য হিসেবে নয় । মানুষের খাদ্য

হিসেবে ব্যবহারের জন্য গরুর মূত্র এভাবে বিক্রি করা অবৈধ । রেফারেন্স

 

তবে কি গরুর গোবর বা মূত্র কোনো কাজেই লাগতে পারে না ?

নাহ, বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয় । বহু প্রাচিন কাল থেকেই গরুর গোবর ও মুত্র চাষের জমি এবং ফসলের জন্য উৎকৃষ্ট মানের

সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে । বর্তমানে আধুনিক সময়েও এর চাহিদা কমেনি বরং বেড়েছে । গবেষকরা গোবর বা মূত্র

থেকে কিভাবে আরো ভাল মানের সার তৈরী করা যায় সে নিয়ে গবেষনা চালাচ্ছেন এবং পৃথিবীব্যাপি প্রচুর সাফল্যও পাওয়া

গেছে।

এছাড়াও কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে বাহ্যিক ভাবে অর্থ্যাৎ ত্বকের জন্য বেশ কিছু উপকারি দিক রয়েছে এই গোমূত্রে ।

 

সব শেষে কিছু কথা

অনেকেই হয়ত জানেন পৃথিবীর বেশ কিছু অঞ্চলে সাপ বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা হয় । এবং সাপের বিষ অতি উচ্চ মূল্যে

বাজারে বিক্রিও করা হয় কিন্তু সেটা সব বাজারে নয় । নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ তৈরীকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে । তার মানে সাপের বিষ

থেকেও ঔষধ তৈরী হতে পারে ! এখন যদি আপনি মনে করেন যেহেতু সাপের বিষ থেকে বিভিন্ন রোগের ঔষধ তৈরী হচ্ছে এবং

প্রয়োগও হচ্ছে তাহলে সেই সব রোগ হলে ডিরেক্ট সাপ মেরে তা থেকে বিষ সংগ্রহ করে খেয়ে নেওয়াই ভাল ! শুধু শুধু অত দাম

দিয়ে ওসব ঔষধ কিনতে যাব কেন?

 

এখানে ফ্যাক্ট হচ্ছে, পদ্ধতি । সাপের বিষ সংগ্রহ করে তা কয়েক ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে তারপরেই কেবল তা থেকে ওষুধ তৈরী

করা হয় । আশা করি, যে কথাটি বলতে চেয়েছি তা বুঝতে পেড়েছেন ।